ইউনূস সরকারের সব উপদেষ্টার দুর্নীতির তদন্তের দাবি


ইউনূস সরকারের সব উপদেষ্টার  দুর্নীতির তদন্তের দাবি

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও প্রভাবশালী ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্য দিয়ে ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জনমনে এখন প্রশ্ন উঠেছে—শুধু আসিফ মাহমুদ নয়, সরকারের অন্য উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও কি একইভাবে তদন্তের আওতায় আসবে?

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সংবাদ সম্মেলনে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩৮ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন কর্মস্থলে পদায়নের আদেশ দেওয়ার বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ১৫০ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য দেড় কোটি টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের স্থানে পদায়ন নিশ্চিত করতে আরও ২ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়া প্রথম ব্যক্তি হিসেবে আসিফ মাহমুদের নাম সামনে এসেছে।

বড় অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আসার দাবি

তবে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক অভিযোগের বাইরেও আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার, সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ও রয়েছে।

তার বন্ধু ও সাবেক সহকারী একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরেও নানা অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, মোয়াজ্জেমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ এবং তার কথিত অবৈধ সম্পদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

দুদকের কাছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশনের অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ নেওয়ার দাবি করা হতো। অর্থ না দিলে প্রকল্পের টাকা ছাড় করা হতো না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে তার কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম ভূমিকা রাখতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওয়াসার এমডি নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে আব্দুস সালামের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই নিয়োগের জন্য আসিফ মাহমুদকে ১০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ের একটি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে এবং বাকি ২ কোটি টাকা নগদে পরিশোধ করা হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগের পেছনে আর্থিক লেনদেন হয়েছিল।

অভিযোগে আরও বলা হয়, নগদ ২০ কোটি টাকা এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজে ১০ শতাংশ কমিশনের শর্তে নিয়োগটি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এজাজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে এবং তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

মিরপুর-গাবতলী পশুর হাটের ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, বোরাক টাওয়ার বা হোটেল শেরাটন-সংক্রান্ত স্বার্থ, বনানী কাঁচাবাজারের দোকান বরাদ্দ, খিলগাঁও তালতলা সুপার মার্কেটের পার্কিং এলাকায় দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দ, ভ্যান সার্ভিস এবং ফুটপাতের দোকান বরাদ্দসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।

টেন্ডার নিয়েও প্রশ্ন

দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এসব টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পরই কার্যাদেশ দেওয়া হতো বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি কথিত কল রেকর্ডও অভিযোগের সঙ্গে জমা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে।

সরকারি পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে দায়িত্ব ছাড়ার আগ পর্যন্ত জনপ্রশাসনের বিভিন্ন বিষয়ে আসিফ মাহমুদ সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন—এমন অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সারাদেশে জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩৬ জনকে পরে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জেলা অনুযায়ী ডিসি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ও প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়া এবং সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও কর্মকর্তারা তার কাছে তদবির করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বিদেশে সম্পদ ও অর্থ রাখার অভিযোগ

আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব প্রকাশের পর তার সম্পদের উৎস নিয়েও আলোচনা হয়। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে তার অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রাখা, দুবাইয়ে সম্পদ ও বিনিয়োগ এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে হিসাব থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার পরিমাণ ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালে বেড়েছে—এমন তথ্য উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা এর সঙ্গে আসিফ মাহমুদ ও ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের অর্থপাচারের সম্ভাব্য যোগসূত্র তদন্তের দাবি করেছেন।

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি

শুধু আসিফ মাহমুদ নয়, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময় বিভিন্ন গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, বিনিয়োগ ও সরকারি সুবিধা পাওয়ার বিষয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা থাকার সময় ফ্রান্সের গ্রামীণ ক্রেডিট এগ্রিকল ফাউন্ডেশন এবং যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ আমেরিকায় নতুন অর্থ বিনিয়োগের ঘটনা ঘটেছে। এসব অর্থের উৎস, অনুমোদন এবং লেনদেনের বৈধতা খতিয়ে দেখার দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন, অনুমোদন, কর-সুবিধা ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা পেয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’র অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি এবং গ্রামীণ ব্যাংকের কর-সংক্রান্ত সুবিধার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা মনে করছেন, এসব সিদ্ধান্ত নিয়ম মেনে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ

সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও বদলি, নিয়োগ, বিচার বিভাগ ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি অন্যতম আলোচিত বিষয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০০ জন ঘুষের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। ভালো জায়গায় বদলির জন্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা এবং সাধারণ বদলিতে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

এ ছাড়া গত বছরের ২ জুন দেশের বিভিন্ন আদালতের ২৫২ জন বিচারককে একযোগে বদলি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এই বদলির পেছনে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করেছে এবং অর্থের বিনিময়ে বদলি করা হয়েছে। একইভাবে জামিনের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের কোনোটি প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় নতুন রিক্রুটিং এজেন্সিকে লাইসেন্স দেওয়া নিয়েও আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন ২৫২টি প্রতিষ্ঠানের রিক্রুটিং লাইসেন্স অনুমোদনের বিষয়টি সামনে এনে এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, তা তদন্তের দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তার সম্পদ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার বিষয়েও অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগেরও যাচাই প্রয়োজন বলে দাবি উঠেছে।

রিজওয়ানা হাসান ও অন্য উপদেষ্টাদের নিয়েও অভিযোগ

সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীকে ঘিরেও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তার স্বামী নসরুল হামিদ বিপুর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সম্পত্তি লেনদেনে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছেন।

তাদের সম্পদ বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।

এ ছাড়া মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরজাহান বেগম ও আদিলুর রহমান খানসহ আরও কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে লিখিতভাবে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তদন্তের আওতা সবার জন্য সমান হবে কি?

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পর এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে—ইউনূস সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা অন্য উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোও কি একইভাবে তদন্ত করা হবে?

দুর্নীতির অভিযোগ রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদা বিবেচনা না করে তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হবে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়মুক্তির পথও পরিষ্কার হবে।

তাই আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানকে একটি সূচনা হিসেবে দেখে ইউনূস সরকারের সময়ের সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থপাচারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানানো হচ্ছে।