দিনের তাপপ্রবাহ এড়াতে রাতে কাজ করছেন জাপানের কৃষকরা


দিনের তাপপ্রবাহ এড়াতে রাতে কাজ করছেন জাপানের কৃষকরা

জাপানে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে কৃষকদের কাজের সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দিনের প্রচণ্ড গরম এড়িয়ে এখন অনেক কৃষক ভোর, সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাতে মাঠ ও গ্রিনহাউসে কাজ করছেন। শুধু জাপান নয়, ভিয়েতনাম থেকে স্পেনের ওয়াইন উৎপাদনকারী অঞ্চল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কৃষকরাও একইভাবে দিনের সবচেয়ে উষ্ণ সময় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন।

জাপানের তোচিগি প্রিফেকচারের নিক্কো শহরের ফুলচাষি মোতোয়াকি ইজিমা তাঁদেরই একজন। ৩৬ বছর বয়সী এই কৃষক দিনের তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকতেই অধিকাংশ কাজ শেষ করার চেষ্টা করেন। তবে প্রয়োজন হলে রাতেও গ্রিনহাউসে কাজ করেন তিনি।

ইজিমার গ্রিনহাউসে দিনের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে ভেতরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপর উঠে যায়। এমন পরিস্থিতিতে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তিন বছর আগে সূর্যমুখী ফুল সংগ্রহের সময় তাঁর এক মৌসুমি কর্মী হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর কাজের সময় বদলের সিদ্ধান্ত নেন ইজিমা।

এখন তাঁর খামারে দিনের সবচেয়ে গরম সময় এড়িয়ে ভোরে কাজ শুরু করা হয়। প্রয়োজন হলে কাজ চলে রাত পর্যন্ত। ইজিমার ভাষায়, নিজেদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পরিবার ও কর্মীরা ধীরে ধীরে রাতের কাজের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।

বয়স্ক কৃষকদের জন্য বাড়ছে ঝুঁকি

জাপানের কৃষি খাতে কর্মরত মানুষের বয়স তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও তীব্র হয়েছে। রয়টার্সের উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষকের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি।

জাপানের আবহাওয়া সংস্থার এক জরিপেও তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী কৃষকদের প্রায় ৬০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেরা হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন অথবা এমন কাউকে চেনেন, যিনি এ সমস্যার শিকার হয়েছেন। একই সংখ্যক কৃষক জানিয়েছেন, দিনের সবচেয়ে গরম সময় এড়াতে তাঁরা নিজেদের কাজের সময় পরিবর্তন করেছেন।

তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু কৃষকদের স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ল্যানসেট কাউন্টডাউনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে জাপানের কৃষি খাতে বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা হারিয়েছে। দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিতেও তাপজনিত কর্মঘণ্টা হ্রাসের প্রভাব পড়ছে।

ইজিমার খামারের ৬৮ বছর বয়সী কর্মী মিয়োকো আসাদাও খুব ভোরে কাজে যোগ দেন। সূর্যের তাপ বাড়ার আগেই তাঁকে ও অন্য কর্মীদের দ্রুত ফুল সংগ্রহ করতে হয়। এরপর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জায়গায় ফুল বাছাই ও প্যাকেটজাত করা হয়।

ভোররাতে মুরগির খামারে কাজ

শুধু ফসল উৎপাদন নয়, গরমের প্রভাব পড়ছে পশুপাখি পালনের ক্ষেত্রেও। তোচিগির মাশিকো এলাকার পোল্ট্রি খামারি তেতসুয়া উসুবা তাপপ্রবাহের কারণে তাঁর খামারের কাজের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছেন।

ছয় বছর আগে মাত্র তিন দিনের তীব্র তাপপ্রবাহে তাঁর ৫০০টির বেশি ডিমপাড়া মুরগি মারা যায়। এরপর থেকেই তিনি রাতের শিফট চালু করেন।

বর্তমানে তাঁর খামারের দুটি মুরগির খোপে রাত ২টা ৩০ মিনিটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলো জ্বলে ওঠে। এতে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ মুরগি জেগে ওঠে এবং দিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার আগেই খাবার গ্রহণ করতে পারে।

মুরগিগুলোকে গরম থেকে রক্ষা করতে খোপে পাখা লাগানো হয়েছে। ধাতব ছাদে পানি ছিটানোর পাশাপাশি পানীয় জলে সাইট্রিক অ্যাসিডও মেশানো হয়। এরপরও পুরোপুরি ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়নি। গত মাসে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ানোর সময় আরও প্রায় ১৩০টি মুরগি মারা যায়।

খামার পরিদর্শনের সময় খোপের ভেতরের তাপমাত্রা ছিল ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অনেক মুরগিকে তখন ঠোঁট খুলে দ্রুত শ্বাস নিতে দেখা যায়। ফলে রোগবালাইয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত গরমও এখন পশুপালকদের জন্য বড় উৎপাদন ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।

প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে জাপান

তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় জাপান সরকারও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কর্মীদের হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা শনাক্ত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নিয়োগকর্তাদের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রাখতে হচ্ছে।

একই সঙ্গে উচ্চ তাপমাত্রায় মানুষের সরাসরি কাজের চাপ কমাতে ড্রোন, রোবটসহ বিভিন্ন স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রযুক্তি এগিয়ে এলেও কৃষিকাজে মানুষের কায়িক শ্রম এখনো পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

তাই আপাতত কাজের সময় পরিবর্তনই অনেক কৃষকের জন্য সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হয়ে উঠেছে। ইজিমার খামারেও ভোরের আলো ফুটতেই কর্মীরা ফুল সংগ্রহ শুরু করেন। সকাল ৮টার আগেই দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের বড় অংশ শেষ করার চেষ্টা থাকে তাঁদের।

কিন্তু সূর্যের তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বস্তিও দ্রুত ফুরিয়ে যায়। আবারও শুরু হয় প্রচণ্ড গরম—আর পরের দিনের কাজের জন্য কৃষকদের ভাবতে হয়, কখন মাঠে নামলে নিরাপদে কাজ করা সম্ভব হবে।