মোবাইল ফোনের অতি ব্যবহারে যেভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে চোখ


মোবাইল ফোনের অতি ব্যবহারে যেভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে চোখ

আধুনিক জীবনে প্রযুক্তি যেমন গতি এনেছে, তেমনি নীরবে তৈরি করছে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকিও। স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা ট্যাবের দীর্ঘ ব্যবহারে এখন চোখের একটি সাধারণ সমস্যার নাম শোনা যাচ্ছে বারবার—ড্রাই আই সিন্ড্রোম।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি কেরাটোকনজাংটিভাইটিস সিক্কা নামে পরিচিত। মূলত চোখে পর্যাপ্ত অশ্রু তৈরি না হওয়া বা অশ্রুর গুণগত মান ঠিক না থাকলে এই সমস্যা দেখা দেয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়েই দ্রুত বাড়ছে এই রোগের প্রকোপ। যুক্তরাষ্ট্রে কোটি সংখ্যক মানুষ ইতোমধ্যে এতে আক্রান্ত, যা প্রাপ্তবয়স্কদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রাই আই এখন আর শুধু চিকিৎসাগত সমস্যা নয়—এটি আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি লাইফস্টাইলজনিত ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।

চোখের প্রাকৃতিক সুরক্ষা কীভাবে কাজ করে

চোখের অশ্রু কেবল পানি নয়; এটি তিন স্তরের একটি জটিল সুরক্ষা ব্যবস্থা। তেল, পানি এবং মিউকাস—এই তিনটি স্তর একসঙ্গে কাজ করে চোখকে আর্দ্র রাখে এবং বাইরের ক্ষতিকর উপাদান থেকে সুরক্ষা দেয়।

লিপিড বা তেলের স্তর অশ্রুকে দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। পানির স্তর চোখ পরিষ্কার রাখে এবং প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা দেয়। আর মিউকাস স্তর অশ্রুকে চোখের পৃষ্ঠে সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়। এই তিন স্তরের যেকোনো একটির ভারসাম্য নষ্ট হলেই শুরু হয় শুষ্কতার সমস্যা।

যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন

ড্রাই আই-এর লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়, তাই শুরুতে অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু উপসর্গ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

  • চোখে বালির মতো খচখচ অনুভূতি
  • জ্বালাপোড়া বা খোঁচা লাগার মতো ব্যথা
  • চোখ ভারী লাগা
  • দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের পর চোখ খুলে রাখতে কষ্ট হওয়া

এছাড়া ঝাপসা দেখা, আলোতে তাকাতে অস্বস্তি কিংবা অকারণে চোখ দিয়ে পানি পড়াও এই রোগের লক্ষণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের পাপড়িতে ময়লা জমে থাকতে দেখা যায়।

স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাব

চিকিৎসকদের মতে, ড্রাই আই বৃদ্ধির বড় কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত স্ক্রিনে সময় দেওয়া। মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের সময় মানুষ স্বাভাবিকের তুলনায় কম পলক ফেলে, ফলে চোখ দ্রুত শুকিয়ে যায়।

এছাড়া কম ঘুম, মানসিক চাপ, দীর্ঘ সময় এসি রুমে থাকা, দূষিত পরিবেশ—সব মিলিয়ে চোখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট হতে থাকে।

ঝুঁকিতে যারা

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অশ্রু উৎপাদন কমে যায়, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। এছাড়া যারা দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার করেন, শুষ্ক পরিবেশে থাকেন বা ডায়াবেটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, তাদের মধ্যে ড্রাই আই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

কিছু ওষুধ, কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার, এমনকি ল্যাসিক সার্জারির পরও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

নিয়ন্ত্রণই মূল সমাধান

ড্রাই আই সম্পূর্ণভাবে নিরাময়যোগ্য না হলেও এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এজন্য জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন জরুরি—স্ক্রিন ব্যবহারের মাঝে বিরতি নেওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, চোখের যত্ন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, উপসর্গকে অবহেলা করলে দীর্ঘমেয়াদে চোখের স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শুরুতেই সচেতন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।