আহতই হননি, তবু মামলায় দাবি ৩৫ গুলি লেগেছে


আহতই হননি, তবু মামলায় দাবি ৩৫ গুলি লেগেছে

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় কিশোর রিমনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা একটি মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, রিমনের শরীরে ৩৫ থেকে ৪০টি গুলি লাগে এবং ধারালো অস্ত্র ও রড দিয়ে তাকে নির্মমভাবে আহত করা হয়। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, ঘটনার সময় রিমন ঢাকাতেই ছিলেন না; তিনি অবস্থান করছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়, যা ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১২৭ কিলোমিটার দূরে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে আদালতে মামলাটি করেন রিমনের বাবা মো. মামুন। মামলার বর্ণনায় বলা হয়, ওই বছরের ৪ আগস্ট দুপুরে ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার এলাকা থেকে বাসায় ফেরার পথে রিমনের ওপর হামলা চালানো হয়। এজাহারে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গুলি ও হামলার অভিযোগ আনা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, শটগানের গুলিতে রিমনের পিঠ, পেট ও হাঁটুসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। এছাড়া রামদা, রড, চাপাতি ও কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করারও অভিযোগ করা হয়। মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তবে তদন্তে এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে জানা যায়, আন্দোলনের পুরো সময় রিমন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার জয়নগর বাজার এলাকায় একটি গাড়ির ওয়ার্কশপে কাজ করছিলেন। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের লোকেশন বিশ্লেষণ করেও ঢাকায় উপস্থিতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

রিমন নিজেও জানিয়েছেন, তিনি ওই সময় ঢাকায় যাননি এবং কোনো হামলার শিকারও হননি। মামলায় তার বয়স ২০ বছর উল্লেখ করা হলেও তিনি দাবি করেন, বর্তমানে তার বয়স ১৭। তিনি বলেন, মামলার বিষয়টি সম্পর্কে তাকে কিছুই জানানো হয়নি এবং কেন তার নামে এমন অভিযোগ আনা হয়েছে, তা তিনি জানেন না।

রিমনের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ২০০৮ সালে তার বাবা বিদেশে চলে যান এবং পরে দেশে ফিরে আলাদা সংসার শুরু করেন। এরপর থেকে তাদের খোঁজখবরও নেননি।

এদিকে মামলার একাধিক আসামি অভিযোগ করেছেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের ফাঁসানো হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টাও করা হয়েছে। কয়েকজন জানিয়েছেন, নাম বাদ দেওয়ার জন্য তাদের আলাদা খরচ করতে হয়েছে। অন্তত পাঁচজন ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে, যদিও তারা প্রকাশ্যে নাম বলতে চাননি।

মামলার বাদী মো. মামুনও পরে স্বীকার করেন, আসামিদের কাউকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তার দাবি, অন্য একজন তাকে দিয়ে মামলা করিয়েছেন। প্রথমে তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতা ইসমাইল ভূঁইয়া তুহিনের নাম উল্লেখ করলেও পরে আবার সেই বক্তব্য থেকে সরে আসেন।

অন্যদিকে তুহিন দাবি করেন, রিমনের আহত হওয়ার ঘটনা সত্য এবং রাজনৈতিক ভয়ের কারণে এখন তা অস্বীকার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মামলার প্রক্রিয়ায় আইনজীবী কিছু ভুল আসামির নাম যুক্ত করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া বলেন, বাদী ও তার সঙ্গে আসা ব্যক্তিরাই আসামিদের নাম-ঠিকানা দিয়েছেন। তিনি শুধু আইনি সহায়তা দিয়েছেন।

পিবিআইর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বিশেষায়িত তদন্ত ও অভিযান শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানজিনা আক্তার জানিয়েছেন, তদন্তে মামলার অভিযোগের কোনো সত্যতা না পাওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে সংস্থাটি।