প্রায় চার কোটি মানুষের থাইরয়েড, অধিকাংশ চিকিৎসার বাইরে


প্রায় চার কোটি মানুষের থাইরয়েড, অধিকাংশ চিকিৎসার বাইরে

দেশে নীরবে বাড়ছে থাইরয়েডজনিত রোগ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ভাষ্য, মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষ কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত হলেও অধিকাংশই তা বুঝতে পারেন না। আক্রান্তদের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি, আর চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন বিপুলসংখ্যক রোগী।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর দ্য থাইরয়েড সেন্টার–এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। তিন দিনব্যাপী থাইরয়েড মেলার উদ্বোধন উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস)–এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী বলেন, দেশে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো থাইরয়েড রোগে ভুগছেন। আক্রান্তদের বড় অংশই নারী। তাঁর ভাষ্য, প্রতি ১০ জন রোগীর মধ্যে প্রায় ৯ জনই নারী এবং জন্মগতভাবেও অনেক শিশু থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে জন্ম নিচ্ছে। প্রতি দুই হাজার ৩০০ শিশুর মধ্যে একজনের এ ধরনের জটিলতা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, উদ্বেগের বিষয় হলো—থাইরয়েড আক্রান্তদের প্রায় ৬০ শতাংশই এখনো চিকিৎসাসেবার আওতায় আসেননি। অনেকেই দীর্ঘদিন বুঝতেই পারেন না যে তারা থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষ করে সাব-ক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত বহু মানুষ সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বংশগত কারণেও থাইরয়েড রোগের ঝুঁকি বাড়ে। পরিবারের মা, নানি বা দাদির কারও থাইরয়েড সমস্যা থাকলে সন্তান বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যেও এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস–এর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. ফরিদুল আলম। তিনি বলেন, থাইরয়েড শুধু ব্যক্তির শারীরিক অসুস্থতাই তৈরি করে না, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বুদ্ধিবিকাশ ও কর্মক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় অকারণে ক্লান্তি, দুর্বলতা, কাজের অনীহা বা অতিরিক্ত ঘুমের প্রবণতা থাইরয়েড সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নারীদের সন্তান ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা বারবার গর্ভপাতের ঘটনাতেও থাইরয়েড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সুস্থ জাতি গঠনে এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি–র মহাসচিব ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, থাইরয়েডকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয় কারণ অনেক রোগী সাধারণ সমস্যা ভেবে লক্ষণগুলোকে অবহেলা করেন। ফলে রোগটি ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারণ করে। তিনি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের ওপর গুরুত্ব দেন।

চিকিৎসকরা জানান, হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, শীত বা গরম সহ্য না হওয়া, চুল পড়া, শরীরব্যথা, বুক ধড়ফড়, হাত-পা কাঁপা, গলার স্বর বদলে যাওয়া, দুর্বলতা, অনিয়মিত মাসিক কিংবা বন্ধ্যাত্ব—এসবই থাইরয়েড সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, গত বুধবার শুরু হওয়া থাইরয়েড মেলা আগামী শনিবার পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মেলায় কম খরচে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, থাইরয়েড পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বিনামূল্যে থাইরয়েড স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জীবনের অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে থাইরয়েড স্ক্রিনিং করা উচিত—জন্মের পর, বয়ঃসন্ধিকালে, গর্ভধারণের আগে এবং ৪০ বছর বয়সের পর। সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই থাইরয়েডজনিত জটিলতা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মত দেন তারা।