
জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) ও তথাকথিত ‘আয়নাঘরে’ গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। সাক্ষ্যে তিনি নিজের গুম হওয়ার পুরো সময়ের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেন।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে মামলার প্রথম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলের সামনে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী।
জবানবন্দিতে তিনি জানান, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট তাকে গুম করা হয়। শুধুমাত্র বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণেই তাকে বারবার নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। নির্যাতনের ফলে তার শরীরজুড়ে ঘা ও পায়ের অংশে বড় ফোঁড়া তৈরি হয়। বন্দিদশায় সময় গোনার একমাত্র উপায় ছিল খাবার— সকালে রুটি এলে তিনি বুঝতেন দিন শুরু হয়েছে, আর দুপুর ও রাতে ভাত-মাছ বা মুরগি-সবজি দেওয়া হতো। প্রথম দুই মাস দেয়ালে পেরেক দিয়ে দাগ কেটে দিনের হিসাব রাখতেন।
হুম্মাম বলেন, ফোঁড়া গুরুতর হলে তিনি ভেবেছিলেন তাকে হাসপাতালে নেওয়া হবে, কিন্তু তা করা হয়নি। পরে একদিন তার সেলে এসে তাকে চৌকির সঙ্গে বেঁধে ফোঁড়ার অপারেশন করা হয়। জ্ঞান ফিরে তিনি মেঝেতে রক্ত, ভেজা গজ ও টিস্যু পড়ে থাকতে দেখেন। তাকে দেওয়া ওষুধ খোলা মোড়কে হাতে করে আনা হতো। একদিন ভুলক্রমে ওষুধের মোড়কে ‘ভিআইপি-১’ লেখা দেখতে পান, তখন তিনি বুঝতে পারেন এটি তার কোডনেম।
তিনি আরও জানান, মাঝেমধ্যেই তাকে ইনজেকশন দেওয়া হতো, যার ফলে পুরো শরীরে আগুন জ্বলার মতো অনুভূতি হতো। বারবার ইনজেকশনের কারণে তার হাত কালো হয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার বাবার রাজনৈতিক ভূমিকা, আওয়ামী লীগের বিরোধিতা এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ আছে কি না— এসব প্রশ্ন করা হতো।
হুম্মাম বলেন, বিপরীত পাশের সেল থেকে নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত ও কান্নার শব্দ শুনতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি জানতে পারেন, ওই বন্দি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার আমান আযমী। তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে, ওই ভবনে তিনি একা ছিলেন না।
তিনি জানান, তার সেলে দুটি দরজা ছিল— একটি লোহার বার ও অন্যটি স্টিলের। একদিন স্টিলের দরজার ফাঁক দিয়ে তিনি একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখেন, যার মাথায় জমটুপি ছিল এবং দাঁড়ি দেখা যাচ্ছিল।
নির্যাতনের অংশ হিসেবে তার সেলে থাকা টিউবলাইট সারাক্ষণ জ্বালানো থাকত। একবার জিজ্ঞাসাবাদের সময় চোখের বাঁধন সরে গেলে তিনি দেখতে পান, ইন্টারোগেশন কক্ষটি ছিল সম্পূর্ণ সাউন্ডপ্রুফ। চারপাশের দেয়াল ছোট ছোট ছিদ্র ও কার্ডবোর্ডজাত কভার দিয়ে ঢাকা ছিল।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, সর্বশেষ জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে বলা হয়, মুক্তি পেলে যেন তিনি বলেন কিছু দুষ্ট লোক তাকে অপহরণ করেছিল এবং তিনি পালিয়ে এসেছেন। তখন তাকে জানানো হয়, ‘অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার আপনাকে সেকেন্ড চান্স দিতে চান’। এতে তিনি বুঝতে পারেন, গুম ও নির্যাতনের পেছনে শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
মুক্তির আগের মুহূর্তের বর্ণনায় হুম্মাম বলেন, একপর্যায়ে তাকে চোখ বেঁধে মাইক্রোবাসে তোলা হয়। গাড়ি থামার পর একজন জিজ্ঞেস করে তিনি ভয় পাচ্ছেন কি না। তখন তিনি বলেন,
‘যদি মেরে ফেলেন, তাহলে আব্বার সঙ্গে দেখা হবে; আর ছেড়ে দিলে আম্মার সঙ্গে।’
পরে তাকে ধানমন্ডি ৭/এ এলাকায় ফুটপাতে নামিয়ে দেওয়া হয়। বাড়িতে পৌঁছাতে প্রথমে দারোয়ান তাকে চিনতে পারেননি। পোষা কুকুর চিনতে পারায় গেট খোলা হয়। এরপর তিনি জানতে পারেন, তার মা গুলশানে বড় ভাইয়ের বাসায় আছেন।
হুম্মাম কাদের চৌধুরী জানান, পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন— তার গুমের সময় সিটিআইবির পরিচালক ছিলেন তৌহিদুল ইসলাম এবং ডিজিএফআই প্রধান ছিলেন জেনারেল আকবর। ২০১৭ সালের ২ মার্চ তাকে মুক্তি দেওয়া হয়, তখন ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলেন জেনারেল আবেদিন।
তিনি বলেন, যারা তাকে গুম করেছে, নির্যাতন করেছে এবং এর নির্দেশ দিয়েছে— শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট সব সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার সর্বোচ্চ শাস্তি তিনি চান।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তার জেরা হয়নি। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল আগামী ২৫ জানুয়ারি জেরার দিন ধার্য করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন :