ট্রাম্পের নতুন আদেশে লাখো বাংলাদেশির স্বপ্নভঙ্গ


ট্রাম্পের নতুন আদেশে লাখো বাংলাদেশির স্বপ্নভঙ্গ

দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আবারও কঠোর অভিবাসন নীতির পথে হাঁটছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে ২১ জানুয়ারি থেকে।

স্থগিতাদেশের আওতায় পড়া দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ দেশের নাম। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্নে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকা লাখো বাংলাদেশি পরিবার হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। গ্রিন কার্ড, ফ্যামিলি রিইউনিয়ন ও এমপ্লয়মেন্ট-ভিত্তিক স্থায়ী ভিসা—সবকিছুই এই সিদ্ধান্তে স্থবির হয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষণায় ‘সাময়িক’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে এই স্থগিতাদেশ সহজে প্রত্যাহারের সম্ভাবনা কম। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতিতে ‘যোগ্য ও স্বনির্ভর’ অভিবাসী ছাড়া অন্যদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

কেন এই সিদ্ধান্ত

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তালিকাভুক্ত দেশগুলো থেকে যাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে সরকারি সহায়তার (ওয়েলফেয়ার, মেডিকেড, ফুড স্ট্যাম্পস, হাউজিং অ্যাসিস্ট্যান্স) ওপর নির্ভরশীল হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। একই সঙ্গে ওভারস্টে, ভিসা জালিয়াতি এবং পাবলিক বেনিফিট ব্যবহারের ঝুঁকিও বেশি বলে তাদের বক্তব্য।

তবে থাইল্যান্ড, ব্রাজিল কিংবা কম্বোডিয়ার মতো দেশ এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় অনেক বিশেষজ্ঞই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এসব দেশের অভিবাসীরা সাধারণত শিক্ষিত ও স্বনির্ভর হলেও ট্রাম্পের ‘সিকিউরিটি ফার্স্ট’ নীতিতে বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

পাবলিক চার্জ নীতির কঠোর প্রয়োগ

১৮৮২ সালের ইমিগ্রেশন অ্যাক্টে থাকা ‘পাবলিক চার্জ’ ধারণাকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে আরও বিস্তৃত করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সেই নীতিকে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব অভিবাসী ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারেন—তাদের আগেই বাদ দেওয়া হবে।

আগে স্বাস্থ্য, বয়স, শিক্ষা, ইংরেজি দক্ষতা, আর্থিক সামর্থ্য ও পারিবারিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। বাইডেন প্রশাসন এই কঠোরতা কিছুটা শিথিল করলেও ট্রাম্প আবারও সেটিকে আরও কড়াকড়িভাবে ফিরিয়ে এনেছেন।

বাংলাদেশিদের জন্য কী অর্থ বহন করে

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রায় ১৪ হাজার ৮৯০ জন বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান। পরবর্তী কয়েক বছরে এই সংখ্যা ওঠানামা করলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ২৪০ জনে। নতুন সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এই গ্রিন কার্ড প্রত্যাশীরাই।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত আইনজীবীরা বলছেন, অনেক বাংলাদেশি পরিবারের একাধিক সদস্যের অভিবাসন আবেদন বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। এ হিসাবে কয়েক লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার সুরক্ষা নীতির অংশ। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন মূলত উচ্চদক্ষ ও পেশাদার অভিবাসীদের সুযোগ দিতে চায়, কিন্তু স্বল্পদক্ষ ও কম মজুরির শ্রমিকদের ঢালাও প্রবেশ সীমিত করতে চাইছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা পেলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি বড় ধাক্কা।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইমিগ্রেশন আইনজীবী মঈন চৌধুরী এই সিদ্ধান্তকে অমানবিক আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন আদেশের ফলে স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের একত্র হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকা অনেক মানুষ মানসিক ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

অর্থনীতিতে প্রভাব

অভিবাসন কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিবছর বাংলাদেশে বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসে, যা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। নতুন সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে পরিবারের আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর।

তবে কেউ কেউ এটিকে ‘ব্লেসিং ইন ডিসগাইজ’ হিসেবেও দেখছেন। ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ব্রেন ড্রেইন কমাতে পারে এবং মেধাবীদের দেশেই কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সামনে কী

এই ভিসা স্থগিতাদেশ কেবল অভিবাসী ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। স্টুডেন্ট, ট্যুরিস্ট কিংবা বিজনেস ভিসা আপাতত এর বাইরে রয়েছে। তবে স্থায়ী বসবাসের স্বপ্নে যারা বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েছেন, তাদের জন্য এটি এক গভীর অনিশ্চয়তার সময়।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত স্বপ্ন ভাঙার গল্প নয়—এটি বাংলাদেশসহ বহু দেশের সমাজ, অর্থনীতি ও পারিবারিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।